নিমাত উল্লাহ
২৪ মে, ২০২৬, 9:47 AM
আবাসিক কওমি মাদরাসার শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে সাধারণ আলেম সমাজের ১০ দফা
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন মাদরাসায় ঘটে যাওয়া কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও অপরাধের মাত্রা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সাধারণ আলেম সমাজ। তারা বলেছে, এসব ঘটনায় অভিভাবক মহলে দুশ্চিন্তা এবং মাদরাসা পরিচালকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
সাধারণ আলেম সমাজের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ পরিস্থিতিতে এখন শুধু ওয়াজ বা তাকওয়ার নসিহত যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি কঠোর প্রশাসনিক তদারকি ও বাস্তবসম্মত নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। গুটিকয়েক অপরিপক্ক পরিচালকের সদিচ্ছার অভাব ও অযোগ্যতার কারণে পুরো মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা কলঙ্কিত হতে পারে না।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ করে আবাসিক ও কওমি মাদরাসার জন্য ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে সাধারণ আলেম সমাজ।
১. পুরো ক্যাম্পাস সিসিটিভির আওতায় আনা ও পাঠনির্ঘণ্ট তৈরি
মাদরাসার প্রবেশদ্বার, বারান্দা, মাঠ ও প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সার্বক্ষণিক সিসিটিভি মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। একজন নির্দিষ্ট দায়িত্বশীল, সিকিউরিটি গার্ড বা বিশ্বস্ত স্টাফ ক্যামেরাগুলো পর্যবেক্ষণ করবেন। পাশাপাশি পরিচালক নিজে প্রতিদিনের ফুটেজ র্যান্ডমলি খতিয়ে দেখবেন।
একই সঙ্গে মাদরাসার নোটিশ বোর্ডে নেযামুল আওকাত বা দৈনিক পাঠনির্ঘণ্ট প্রণয়ন করে সময়সূচি অনুযায়ী মাদরাসার সার্বিক পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে।
২. অভিযোগ বক্স স্থাপন ও গোপনীয়তা রক্ষা
মাদরাসার বিভিন্ন পয়েন্টে তালাবদ্ধ অভিযোগ বক্স রাখতে হবে। কোনো ছাত্র উস্তাদ বা সহপাঠীর মাধ্যমে কোনো অন্যায়ের শিকার হলে এবং তা সরাসরি বলতে ইতস্তত বোধ করলে, সে যেন লিখিতভাবে অভিযোগ জানাতে পারে। এই বক্সের চাবি কেবল পরিচালক বা দায়িত্বশীলের কাছে থাকবে। অভিযোগকারীর পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখে দ্রুত তদন্ত করতে হবে।
৩. তিন বা ছয় মাস পর সেফটি ও সিকিউরিটি প্রোগ্রাম আয়োজন
মাদরাসায় প্রতি তিন বা ছয় মাস অন্তর বেফাক বা নিজ শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সচেতনতামূলক সেমিনারের আয়োজন করতে হবে। এতে অপরাধীদের মনে আইনের ভয় তৈরি হবে। একই সঙ্গে ছাত্ররা যে কোনো অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা ও পরামর্শ সম্পর্কে জানতে পারবে।
৪. বাধ্যতামূলক অভিভাবক সমাবেশের আয়োজন
প্রতি তিন মাসে, সম্ভব হলে প্রতি মাসে বাধ্যতামূলকভাবে অভিভাবক সমাবেশের আয়োজন করতে হবে। সেখানে পরিচালকের উপস্থিতিতে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের সার্বিক অগ্রগতি, আচরণ এবং যে কোনো অভিযোগ বা প্রস্তাব সরাসরি উত্থাপন করতে পারবেন। অভিভাবকদের মাদরাসার বোর্ডিং, বাথরুম ও পরিবেশ সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিতে হবে।
৫. নিয়মিত তরবিয়তি মজলিস ও তাবলীগী সফর
শিক্ষার্থীদের নৈতিক স্খলন রোধে প্রতি সপ্তাহে বা মাসে অন্তত একবার একজন আহলুল্লাহ বুজুর্গ আলেমকে এনে বিশেষ তরবিয়তি মজলিস করতে হবে। এছাড়া ছাত্র ও শিক্ষক উভয়ের আত্মশুদ্ধির জন্য মাসে অন্তত দুই দিনের জন্য জামাতে তাবলীগে যাওয়া বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
৬. শিক্ষকদের সাপ্তাহিক মুহাসাবা ও প্রশিক্ষণ
প্রতি সপ্তাহে শিক্ষকদের নিয়ে জবাবদিহিমূলক মুহাসাবা মিটিং করতে হবে। সেখানে ছাত্রদের আচরণ এবং কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নজরে এলে তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
এছাড়া শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব ও মানসিক দক্ষতা বাড়াতে শিক্ষাবোর্ডের দায়িত্বশীল বা দক্ষ ট্রেইনারদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত বেতন ও পর্যাপ্ত ছুটির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার জন্য বোর্ড থেকে একটি নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল প্রণয়ন করা হলে তা কার্যকর হবে।
৭. অনুমোদন ও কমিটির ব্যবস্থাপনা
যত্রতত্র অননুমোদিত এবং অপরিপক্ক ব্যক্তিদের মাধ্যমে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
প্রতিটি মাদরাসার, তা ভাড়া বাড়িতে হোক বা নিজস্ব জায়গায়, বোর্ড কর্তৃক নিবন্ধন থাকতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় আলেম ও দ্বীনদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি সক্রিয় কমিটি থাকতে হবে, যাতে পরিচালক এককভাবে স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন।
৮. শিক্ষকদের কেন্দ্রীয় নিবন্ধন ও ব্ল্যাকলিস্ট পদ্ধতি চালু
বোর্ডের অধীনে সব শিক্ষক ও পরিচালকের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ এবং নিবন্ধন নম্বর থাকতে হবে। কোনো শিক্ষক বা পরিচালকের বিরুদ্ধে বিকৃত যৌনাচার, শারীরিক নির্যাতন বা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হলে তার নিবন্ধন স্থায়ীভাবে বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে তাকে কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে, যাতে তিনি দেশের আর কোনো মাদরাসায় চাকরি বা পরিচালনার সুযোগ না পান।
৯. অপরাধ গোপন না করে আইনের আওতায় আনা
মাদরাসার অভ্যন্তরে কোনো বলাৎকার বা ফৌজদারি অপরাধ ঘটলে তা মাদরাসার মান-সম্মানের দোহাই দিয়ে ধামাচাপা দেওয়া এবং স্থানীয়ভাবে আপস করার চেষ্টা না করাই ভালো। বরং তদন্তসাপেক্ষে প্রকৃত অপরাধীকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় আইনের হাতে সোপর্দ করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
১০. অভিভাবক ও স্থানীয় সমাজের সচেতনতা
অভিভাবকদের উচিত কেবল মাদরাসায় সন্তান ভর্তি করেই দায়িত্ব শেষ না করা। ছুটির দিনে সন্তানের মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা, মাদরাসার সার্বিক পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যসচেতনতার ব্যাপারে খোঁজখবর রাখা জরুরি। এজন্য অভিভাবকদের নিয়মিত মাদরাসার দায়িত্বশীলদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। স্থানীয় সমাজকেও মাদরাসার সার্বিক কর্মকাণ্ডের ওপর নেকনজর রাখতে হবে।
সাধারণ আলেম সমাজের পক্ষ থেকে বলা হয় , অপরাধী যে-ই হোক, দাড়ি-টুপি কিংবা বড় আলেমের দোহাই দিয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। ইসলামের বিধান অনুযায়ী তাকওয়ার পাশাপাশি শাস্তির ভয়ও থাকতে হবে।
তারা আরও বলেন, আলেম সমাজকেই প্রথম সোচ্চার হতে হবে, যাতে কোনো পাপিষ্ঠ ব্যক্তির কারণে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা বা আলেম সমাজের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না হয়।
সাধারণ আলেম সমাজের মতে, এসব পদক্ষেপের অধিকাংশ বাস্তবায়নে বড় কোনো আর্থিক ব্যয় নেই। কেবল দরকার পরিচালকদের সদিচ্ছা, কর্মতৎপরতা এবং কঠোর প্রশাসনিক মনোভাব।
সাধারণ আলেম সমাজ আরও বলেন, সময় থাকতে নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার না করলে সমাজ ও রাষ্ট্রের মুখোমুখি হতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সব ধরনের অরাজকতা থেকে হেফাজত করুন।